Wednesday, January 4, 2017

ইসি নিয়োগে আইন চায় অধিকাংশ দল ১১ দলের সঙ্গে সংলাপ করেছেন রাষ্ট্রপতি * সার্চ কমিটি ও সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠনের দাবি * কমিশনের সদস্য সংখ্যা ৮ করার প্রস্তাব

নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে সংবিধানের নির্দেশনা মেনে দ্রুত আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে আলাদা নামের তালিকাও হস্তান্তর করেন দলগুলোর নেতারা। একই সঙ্গে তারা সার্চ কমিটি এবং সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব দেন। কমিশনে এক বা একাধিক নারী সদস্য নিয়োগ, কমিশনের সদস্য সংখ্যা আটে উন্নীত করা, কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করার কথা বলেন নেতারা।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে দলগুলোর নেতারা প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন। তবে কৌশলগত কারণে কোনো দলই প্রস্তাবিত নামগুলো প্রকাশ করেননি।
কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষে আগামী ফেব্র“য়ারিতে দায়িত্ব নেবে নতুন ইসি। ওই কমিশনের অধীনেই ২০১৯ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইসি পুনর্গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিয়ে সংলাপে বসার উদ্যোগ নেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। প্রথম দফায় গত ১২ ডিসেম্বর পাঁচটি দলকে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানায় বঙ্গভবন। গত ১৮ ডিসেম্বর বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসার মধ্য দিয়ে সংলাপ শুরু হয়। সোমবার পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি জাতীয় পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ), ইসলামী ঐক্যজোট এবং জাতীয় পার্টি- জেপিসহ ১১টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করেন।
বিএনপির ৩ প্রস্তাব : ইসি পুনর্গঠনে রাষ্ট্রপতির কাছে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি সুনির্দিষ্ট তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে। এগুলো হল : সার্চ কমিটি গঠন, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ এবং আরপিও সংশোধনসহ ইসি শক্তিশালীকরণ। সব দলের মতক্যৈর ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করে দলটি। তারা সাবেক একজন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠনের সুপারিশ করে। একই সঙ্গে সার্চ কমিটির সদস্য এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশনারসহ ১০ জনের নামের একটি তালিকাও রাষ্ট্রপতির কাছে হস্তান্তর করে দলটি। এ তালিকায় সাবেক প্রধান বিচারপতি, আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, সাবেক আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসিসহ একজন নারী সদস্যের নাম রয়েছে।
বঙ্গভবনে গত ১৮ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিএনপির সংলাপের সময় সার্চ কমিটি ও নির্বাচন কমিশনারের যোগ্যতার বিষয়টিও বিএনপির আলোচনায় উঠে আসে। দল নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য, দক্ষ ও সাহসী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে এসব কমিটি করার অনুরোধ জানানো হয়। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১১ সদস্যের প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নেয়।
জাতীয় পার্টির ৫ প্রস্তাব : রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির নেতারা নির্বাচন কমিশন গঠনে সংবিধান মেনে আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে পাঁচ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। নতুন বছরের শুরুতে দশম জাতীয় সংসদের যে অধিবেশন বসবে, সম্ভব হলে সেই অধিবেশনেই এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের দাবি জানানো হয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন দলটি সংলাপে অংশ নিয়ে ইসি পুনর্গঠন ইস্যুতে পাঁচ দফা প্রস্তাবনাও তুলে ধরে।
জাতীয় পার্টির পাঁচ দফা প্রস্তাবনাগুলো হল : সংবিধান অনুসারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশন নিয়োগসংক্রান্ত একটি আইনি কাঠামো প্রণয়ন করা। এতে নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাখা হবে। নির্বাচন কমিশনের জন্য আলাদা সচিবালয় স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া প্রস্তাবে নির্বাচন কমিশনারদের বিষয়ে নিরপেক্ষতা, ব্যক্তিগত একাগ্রতা ও সততা, ন্যূনতম ও সর্বোচ্চ বয়স, পেশাগত যোগ্যতা, নির্বাচনসংক্রান্ত বিষয়জ্ঞান, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়তা না থাকা, অন্য অফিসে নিয়োগে বিধিনিষেধ ও চারিত্রিক স্বচ্ছতার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এসব অন্তর্ভুক্ত করে বর্তমান সংসদেই এ আইন পাস করার কথা উল্লেখ করা হয়। ২০ ডিসেম্বর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে ১৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বঙ্গভবনের দরবার হলে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নেয়।
এলডিপির ১৭ দফা ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের ৯ দফা প্রস্তাব : রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য চলতি দশম জাতীয় সংসদেই আইন প্রণয়নসহ ১৭ দফা প্রস্তাব দিয়েছে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটিতে কারা স্থান পেতে পারেন তার একটি তালিকাও রাষ্ট্রপতির কাছে দিয়েছে দলটি। এলডিপির উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবের মধ্যে আছে- সংবিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশন নিয়োগসংক্রান্ত একটি আইনি কাঠামো প্রণয়ন। নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাখার বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের জন্য আলাদা সচিবালয় গঠন; নির্বাচন কমিশনারদের ন্যূনতম ও সর্বোচ্চ বয়স নির্ধারণ, নিরপেক্ষতা, ব্যক্তিগত একাগ্রতা ও সততা, অন্য অফিসে নিয়োগে বিধিনিষেধ, নির্বাচনসংক্রান্ত বিষয়জ্ঞান, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় না থাকা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনকালীন প্রতিরক্ষা বাহিনী মোতায়েন ও তাদের পুলিশের ন্যায় ক্ষমতা প্রদান করা।
গত ২১ ডিসেম্বর বঙ্গভবনের দরবার হলে প্রথমে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে এলডিপির সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর অনুষ্ঠিত হয় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সঙ্গে। এতে নির্বাচন কমিশনে একজন নারী সদস্য নিয়োগের দাবিসহ ৯ দফা প্রস্তাব দিয়েছে বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ।
সংলাপ শেষে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘অনেকে মনে করেন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নেই। আমাদের বা রাষ্ট্রপতির সৌভাগ্য যে সংবিধানে ১১৮ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে ইসি গঠনে রাষ্ট্রপতির জন্য কোনো ধরনের বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি স্বাধীন ও মুক্তভাবে ইসি গঠন করতে পারেন।’ তিনি রাষ্ট্রপতিকে বছরে কমপক্ষে দু’বার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করার অনুরোধ করেছেন। এ নেতা বলেন, ‘সার্চ কমিটির জন্য কারও নাম প্রস্তাব করিনি। সার্চ কমিটি করেই হোক আর না করেই হোক, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি যেভাবে ইসি গঠনে কাজ করবেন তার সঙ্গেই আমরা থাকব।’
সার্চ কমিটি-ইসিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীদের চায় জাসদ : মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধানের চার মূল নীতিতে আস্থাশীল ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের জন্য সার্চ কমিটি ও ইসি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে জাসদের ১২ সদস্যের প্রতিনিধিদল গত ২৬ ডিসেম্বর বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নেয়। এতে তারা সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করাসহ সাত দফা প্রস্তাব দিয়েছেন। আইন প্রণয়নের পূর্বে নির্বাচন কমিশন গঠন বিষয়ে প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি ও হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি এবং দেশের সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত এমন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে বাছাই কমিটি গঠন করার প্রস্তাব দেয়া হয়।
সাংবিধানিক কাউন্সিলসহ ইসি নিয়োগে আইন চায় ওয়ার্কার্স পার্টি : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন গঠনে সংবিধান অনুযায়ী আইন চায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। এ ছাড়া সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারদের নিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি ও অ্যাটর্নি জেনারেলকে নিয়ে সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠনসহ ৮ দফা প্রস্তাব দিয়েছে দলটি। সাংবিধানিক কাউন্সিল রাষ্ট্রপতির কাছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য নাম প্রস্তাব করবে। রাষ্ট্রপতি তাদের পরামর্শমতো প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারদের নিয়োগ করবেন। বিকল্প হিসেবে নির্বাচন কমিশন নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি, দুদক চেয়ারম্যান, মহাহিসাবরক্ষক এবং নিয়ন্ত্রক ও অ্যাটর্নি জেনারেলসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের নিয়ে এ সার্চ কমিটি গঠন করতে পারেন। গত ২৭ ডিসেম্বর ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেননসহ তার দলের ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে এ প্রস্তাব দেয়। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং সার্চ কমিটি গঠনের বিষয়ে প্রস্তাব দেয় আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল। ইসলামী ঐক্যজোটের আট ও বিএনএফের পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন দল দুটির নেতারা। এ ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে প্রতিবন্ধকতাগুলো নিরসনের দাবি জানিয়েছেন জেপির নেতারা। বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির নেতারাও ইসি গঠনে আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।

সৌজন্যে : দৈনিক যুগান্তর

No comments: