
মহাকাশে আধিপত্য বিস্তারে আরও একধাপ এগিয়ে গেল চীন। তারা একাই শুরু করেছে মহাকাশে স্টেশন নির্মাণের কাজ। এজন্য গত সপ্তাহে তারা রকেটের মাধ্যমে পাঠিয়েছে স্টেশনের প্রথম মডিউল। আগামী বছর তারা আরও কয়েকবার রকেট উেক্ষপণ করবে মহাশূন্যে।
চীনের উত্তরাঞ্চলের গোবি মরুভূমিতে জিউকুয়ান মহাশূন্য কেন্দ্র থেকে নিক্ষিপ্ত হয় রকেট ‘লংমার্চ টু এফ’। ৬২ মিটার লম্বা এই রকেটের মাথায় রয়েছে একটি স্পেস মডিউল, যার নাম ‘তিয়াংগং ওয়ান’। চীনা তিয়াংগং শব্দের অর্থ স্বর্গের প্রাসাদ। চীনা পুরাণ অনুযায়ী, মহাশূন্যে রয়েছে একটি স্বর্গীয় প্রাসাদ, যাতে বাস করেন দেবতারা। সেই দেবতাদের প্রাসাদ নির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে এবার মহাশূন্যে যাত্রা করল তিয়াংগং ওয়ান।
সাড়ে ১০ মিটার লম্বা এবং ওজনে প্রায় সাড়ে ৮ টন এই স্পেস মডিউলটিকে নিয়ে মহাশূন্যে পাড়ি দিল রকেট লংমার্চ। ভূপৃষ্ঠ থেকে সাড়ে ৩০০ কিলোমিটার ওপরে এখন এই মডিউলটি কৃত্রিম উপগ্রহ হয়ে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। মনুষ্যবিহীন এই মডিউলটিতে রয়েছে একটি ল্যাবরেটরি। তবে আশা করা হচ্ছে আগামী বছর সেখানে মানুষের পা পড়বে। আর সে লক্ষ্যেই এখন কাজ চলছে ‘সেনঝু এইট’ উেক্ষপণের।
আর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই সেনঝু এইট উেক্ষপিত হবে মহাশূন্যের উদ্দেশে। এই সেনঝু এইট হলো মহাকাশ স্টেশনের ল্যাবরেটরির বাকি অংশ। সেনঝু এইট গিয়ে মিলিত হবে তিয়াংগং ওয়ানের সঙ্গে। দুটি মিলে তৈরি হবে চীনের প্রথম মহাকাশ স্টেশনের ল্যাবরেটরি। এই ল্যাবরেটরির মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হবে মহাশূন্যে একটি স্টেশন নির্মাণের যাবতীয় খুটিনাটি তথ্য। এরপর আগামী বছরের মধ্যে পাঠানো হবে আরও দুই উপগ্রহ ‘সেনঝু নাইন’ এবং ‘সেনঝু টেন’। মনে করা হচ্ছে, এই দুই কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে চীনা নভোযাত্রীরাও সেখানে গিয়ে মহাকাশ স্টেশন নির্মাণের কাজ চালাবেন।
চীন আশা করছে, ২০২০ সালের মধ্যে তারা মহাকাশ স্টেশন নির্মাণের কাজ শেষ করবে। তবে এই মুহূর্তে তাদের চিন্তা পরবর্তী মডিউল সেনঝু এইট নিয়ে। তারচেয়েও বড় কাজ হবে মহাশূন্যেই তিয়াংগং ওয়ান এবং সেনঝু এইট এই দুই মডিউলের মিলন ঘটানো। তিয়াংগং ওয়ানের প্রধান ডিজাইনার ইয়াং হং বলেছেন, দুটি মডিউলকে এক জায়গায় নিয়ে আসা এবং দুটিকে জোড়া লাগানোটা হচ্ছে অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তির কাজ। এই দুটিকে জোড়া লাগানোটা মহাকাশ স্টেশন নির্মাণের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। চীনের ‘তাইকোনট’ বা মহাকাশচারীরা মহাকাশে নিজেদের জায়গা করে নিতে প্রস্তুত।
চীনের পরিকল্পিত এই মহাকাশ স্টেশনের আকার অবশ্য খুব একটা বড় হবে না। তাদের পরিকল্পিত স্টেশনটি হবে ৬০ টন ওজনের। অন্যদিকে নির্মীয়মাণ আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা আইএসএসের ওজন হচ্ছে ৪০০ টন। এই আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন নির্মাণের সঙ্গে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপ, জাপান এবং কানাডা। তাই চীন আলাদাভাবেই নিজের প্রযুক্তি দিয়ে মহাকাশ স্টেশন তৈরির পথে হাটল। তিয়াংগং ওয়ান-এর উেক্ষপণ চীনের প্রযুক্তির সামর্থ্যের আবারও প্রমাণ হাজির করল বিশ্ববাসীর সামনে।
চীন গত কয়েক বছর ধরে তাদের মহাশূন্য কর্মসূচিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢালছে। শুধু মহাকাশ স্টেশন নির্মাণ নয়, চীনা কর্তৃপক্ষ এখন প্রথমবারের মতো এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার তৈরির কথাও ভাবছে। গত বছর চীন চাঁদের উদ্দেশে দ্বিতীয়বারের মতো কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়েছে। এর আগে ২০০৮ সালে চীনা নভোচারী মহাশূন্যে হেঁটে ইতিহাস তৈরি করেন। চীনা কর্তৃপক্ষ আশা করছে, আগামী বছরের মধ্যেই তাদের উপগ্রহ চাঁদের বুকে পা রাখবে। আগামী ২০১৭ সালের মধ্যে তারা চাঁদের মাটি এবং পাথর পৃথিবীতে নিয়ে আসবে এবং সর্বশেষ ২০২০ সালের মধ্যে চীনা নভোচারীরা চাঁদের বুকে পা রাখবে। এভাবেই অর্থনীতির পাশাপাশি প্রযুক্তিতেও নতুন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে চায় চীন।
No comments:
Post a Comment